আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাশিয়ার স্যাটেলাইট মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার উপর বিস্তারিত ছবি তুলেছে। এই ছবি ইরানকে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা মার্কিন বাহিনী ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার একটি মূল্যায়নে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
রয়টার্স এই মূল্যায়নটি পর্যালোচনা করেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের হ্যাকাররা মিলে সাইবার হামলাও চালাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া কীভাবে গোপনে ইরানকে সহায়তা করছে, এই মূল্যায়নে সেটির সবচেয়ে বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।
মূল্যায়নে বলা হয়, গত ২১ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রুশ স্যাটেলাইট মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি দেশে কমপক্ষে ২৪ বার সরেজমিন জরিপ চালিয়েছে। এতে মার্কিন ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং তেলক্ষেত্রসহ মোট ৪৬টি স্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মূল্যায়নে আরও বলা হয়, এসব স্থান জরিপের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সেখানে হামলা চালায়। এটিকে একটি স্পষ্ট ধারা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি পশ্চিমা সামরিক সূত্র এবং একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে জানায়, তাদের গোয়েন্দা তথ্যেও এই অঞ্চলে রুশ স্যাটেলাইটের তীব্র তৎপরতার প্রমাণ মিলেছে। এবং ইরানকে ছবি সরবরাহ করা হয়েছে বলেও তারা নিশ্চিত করেছে।
সৌদি আরবের উপর নয়টি জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল হাফার আল-বাতিনের কাছে অবস্থিত কিং খালিদ মিলিটারি সিটির উপর। ইউক্রেনীয় মূল্যায়ন বলছে, সেখানে মার্কিন তৈরি থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তুরস্ক, জর্দান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন এলাকা দুইবার করে জরিপের আওতায় আসে। ইসরাইল, কাতার, ইরাক, বাহরাইন এবং ডিয়েগো গার্সিয়া নৌ ঘাঁটি একবার করে জরিপ হয়।
মূল্যায়নে আরও বলা হয়, রুশ স্যাটেলাইট হরমুজ প্রণালির উপরও সক্রিয়ভাবে নজরদারি চালাচ্ছে। বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহের এক পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ইরান এখন ‘বৈরী নয় এমন জাহাজ’ ছাড়া বাকি সবার জন্য এই পথে একটি অলিখিত অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘কোনো দেশের বাইরের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সাফল্যকে প্রভাবিত করছে না।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি।
জি-৭ বৈঠকে ইউরোপীয় নেতারা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে এই বিষয়টি তোলেন। দুই কূটনীতিক জানান, রুবিও সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি প্রকাশ্যে ইরানকে রাশিয়ার সহায়তাকে নগণ্য বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইউক্রেনীয় মূল্যায়ন বলছে, স্যাটেলাইট ছবি আদান-প্রদান একটি স্থায়ী যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই চ্যানেলটি রাশিয়া ও ইরান ব্যবহার করে। তেহরানে মোতায়েন রুশ সামরিক গুপ্তচরদের মাধ্যমেও এই কাজ সহজ হতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্র একটি বিশেষ ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহে এটি প্রকাশ করেছিলেন। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির উপর ইরান হামলার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি রুশ স্যাটেলাইট সেখানের ছবি তুলেছিল। গত ২৭ মার্চ ইরান সেই ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং একটি অত্যাধুনিক মার্কিন ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াকস বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরদিন ২৮ মার্চ আরেকটি রুশ স্যাটেলাইট ওই স্থান পর্যবেক্ষণ করে হামলার ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে আরও গভীর হয়েছে। সেই সময় রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে। গত বছরের জানুয়ারিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এবং সাধারণ হুমকি মোকাবেলায় উভয় পক্ষের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে।’
সাইবার ক্ষেত্রেও রাশিয়া ইরানকে সহায়তা দিচ্ছে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ইরান নিয়ন্ত্রিত হ্যাকার গ্রুপগুলো তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। তারা মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করছে।
মূল্যায়নে বলা হয়, রুশ হ্যাকার গ্রুপ ‘জেড-পেনটেস্ট অ্যালায়েন্স’, ‘নোনেম০৫৭(১৬)’ ও ‘ডিডোসিয়া প্রজেক্ট’ এবং ইরানের ‘হান্দালা হ্যাক’ একসাথে কাজ করছে। তারা টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছে। গত মাসে হান্দালা হ্যাকসহ কয়েকটি গ্রুপ ইসরাইলের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় হামলার হুঁশিয়ারি দেয়। একই সময়ে রুশ গ্রুপগুলো ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রবেশ তথ্য প্রকাশ করে দেয়।
এছাড়া ইরানের হ্যাকার গ্রুপ ‘হোমল্যান্ড জাস্টিস’ ও ‘কর্মাবিলো৮০’ রুশ সামরিক গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া কৌশল ব্যবহার করেছে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়। তারা ডোমেইন নিবন্ধনে চেলিয়াবিনস্কের রুশ ভিপিএস সেবাদাতা ‘প্রফিটসার্ভার’ ব্যবহার করেছে।